কথা বলার সময় অনেকের মুখ থেকে বেশ দুর্গন্ধ বের হয়৷দুর্গন্ধটা অনেক সময়ই ভীষণ বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিরক্তি লাগে নিজের কাছে। কাছাকাছি যাঁরা থাকেন তাঁদেরও। ব্যক্তিগত সমস্যার পাশাপাশি এটি সামাজিক সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। বন্ধুবান্ধব বা সহকর্মীর সামনে কথা বলতে ইতস্ততবোধ হয়। কথা হয় নিচু স্বরে। কথা বলতে গিয়ে যদি মুখের দুর্গন্ধটা বের হয়ে যায়! লজ্জার ব্যাপার, বিব্রতকর পরিস্থিতি। মুখের দুর্গন্ধ দূর করাটা তখন জরুরি হয়ে ওঠে৷
মুখ দুর্গন্ধ হওয়ার চারটি কারণ
আনুমানিক 25 শতাংশ মানুষ দুর্গন্ধযুক্ত শ্বাষ বা হ্যালিটোসিসের রোগে আক্রান্ত৷ হ্যালিটোসিসের সম্ভাব্য বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মৌখিক স্বাস্থ্যবিধি ঠিকঠাক না মানার ফলে হ্যালিটোসিসের হয়ে থাকে৷
১/শুষ্ক মুখ
৮৫ থেকে ৯০ শতাংশের ক্ষেত্রে এ দুর্গন্ধটা সুস্থ ও স্বাভাবিক মুখের ভেতরেই উৎপন্ন হয়। আমরা যে খাবার খাই, সে খাবারের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণা জিহ্বার উপরিভাগে আর দাঁত ও মাড়ির ফাঁকে ফাঁকে লেগে থাকে। মুখের ভেতরে বসবাসরত জীবাণু বেঁচে থাকে এসব খাদ্যকণা খেয়ে। জীবাণুগুলো যখন এসব খাদ্যকণা খেতে থাকে, তখন খাদ্যকণা ভেঙে দুর্গন্ধযুক্ত গ্যাস উৎপন্ন হয়। এই গ্যাস কথা বলার সময় দুর্গন্ধ হয়ে বেরিয়ে আসে।
২/অন্যান্য দৈহিক রোগঃ
বিভিন্ন ধরনের দৈহিক রোগ আপনার মুখে দুর্গন্ধের সৃষ্টি করতে পারে। তারমধ্যে
দাঁত ও মাড়ির ইনফেকশন, শ্বাসনালির ইনফেকশন, ফুসফুসের ইনফেকশন, লিভারের অসুখ, ডায়াবেটিসের জটিলতা
kidney disease, respiratory disease ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
৩/বাজে গন্ধ উৎপন্নকারী খাবার বেশি খেলে
রসুন, পেঁয়াজ, মুলা খাওয়া কিংবা ধূমপান, মদ্যপান ইত্যাদির পর মুখে সাময়িক দুর্গন্ধ লেগে থাকতে পারে
৪/অনিয়মিত দাঁতের পরিচর্যা
অপর্যাপ্ত মৌখিক(oral) যত্নের ফলে দাঁত এবং মাড়ির উপর ব্যাকটেরিয়া দ্রুত বিস্তারের লাভ করে এবং মুখকে দুর্গন্ধময় করে তুলে৷
মুখের দুর্গন্ধ দূর করতে নিচের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা যেতে পারেঃ
নিয়মিত মুখের পরিচর্যা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মুখের ভেতর খাবারের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণা যেন লেগে থাকতে না পারে সে জন্য প্রতিবার খাবারের পর অবশ্যই দাঁত মেজে মুখ পরিষ্কার করুন। জিহ্বাও পরিষ্কার করুন সেই সঙ্গে। মাউথওয়াশও উপকারী। রাতে ঘুমানোর আগে একবার ব্রাশ করে নিন৷'
আপনার জিহ্বা পরিষ্কার করুন। শুধু দাঁত ব্রাশ করা যথেষ্ট নয়। আমাদের জিভে প্রচুর পরিমানে ব্যাকটেরিয়া আশ্রয় নিয়ে থাকে৷ তাই নিয়মিত জিভ পারিষ্কার করে রাখতে হবে৷ তা নাহেল মুখে দুর্গন্ধ হতে পারে৷
ঘন ঘন জল বা অন্য কোনো তরল পানীয় পান করুন। এতে কিছু খাবারের কণা ধুয়ে যাবে। দুর্গন্ধ সৃষ্টিকারী গ্যাস ধুয়ে যাবে। মুখ পরিষ্কার থাকবে।
মুখের লালা, খাদ্যকণা, জীবাণু ও দুর্গন্ধ সৃষ্টিকারী গ্যাস ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করতে সহায়তা করে। মুখে লালা তৈরি করতে লবঙ্গ, আদা, চুইংগাম (চিনিমুক্ত হলে ভালো) ইত্যাদি চিবোতে পারেন।
বাইরে লোক সমাগমে যাওয়ার আগে কাঁচা পেঁয়াজ, রসুন ইত্যাদি খাবার পরিহার করুন।
মাউথওয়াশ ব্যবহার করুন৷ মাউথওয়াশ আপনার মুখের গন্ধ দুরে রাখে এবং খারাপ শ্বাস প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে।
ধূমপান ও মদ্যপান পরিহার করুন।
এক কাপ জলে এক টেবিল চামচ লেবুর রস, নুন মিশিয়ে মুখ ধুয়ে নিন। মুখ শুকিয়ে যাবে না, দুর্গন্ধও দূর হবে।
খাবার খাওয়ার আগে এক গ্লাস জলে এক টেবিল চামচ অ্যাপেল সিডার ভিনিগার মিশিয়ে খেয়ে নিন। এতে হজম ভাল হবে, দুর্গন্ধও কাটবে। এই জল দিয়ে গারগলও করুন।
মুখের মধ্য কয়েকটা লবঙ্গ ফেলে রাখুন। চিবোতে থাকলে লবঙ্গের রস মুখের দুর্গন্ধ দূর করবে। এক কাপ জলে এক চা চামচ লবঙ্গ দিয়ে ৫ থেকে ১০ মিনিট ফুটিয়ে নিন। দিনে দু’বার এই লবঙ্গ চা খান।
দারুচিনির মধ্যে সিনামিক অ্যালডিহাইড থাকে। এই এসেনশিয়াল অয়েল মুখের ব্যাকটেরিয়া কমিয়ে বাজে গন্ধ রুখতে সাহায্য করে। এক কাপ পানির মধ্যে এক চামচ দারচিনি গুঁড়ো ফুটিয়ে সেই পানি দিনে দু’বার মুখে ধুয়ে নিন। এই পানিতে তেজপাতাও মেশাতে পারেন।
নিয়মিত মুখ ও দাঁতের চেকআপ করুন।
দাঁত ও মাড়ির ইনফেকশন, শ্বাসনালির ইনফেকশন, ফুসফুসের ইনফেকশন, লিভারের অসুখ, ডায়াবেটিসের জটিলতা—এসবের কোনোটির কারণে মুখে দুর্গন্ধ হলে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করুন।
মুখের দুর্গন্ধ কি আপনাকে লজ্জায় ফেলে দেয়? কারও কাছাকাছি যাওয়ার আগে এর জন্য হীনমন্যতায় ভোগেন। কিছু বদঅভ্যাস বা শারীরিক কিছু গোলমালের জন্য মুখে দুর্গন্ধ হয়ে থাকে। জেনে নিন মুখের দুর্গন্ধ দূর করার কিছু ঘরোয়া টোটকা।
১। মৌরি-
মুখশুদ্ধি হিসেবে খুব ভাল কাজ করে মৌরি। খাওয়ার পর এক চামচ মৌরি রাখুন মুখে। এতে মুখে দুর্গন্ধও হবে না, হজমও ভাল হবে। যদি আপনার মুখে বাজে গন্ধ হওয়ার প্রবণতা থাকে তবে এক কাপ গরম জলে এক চামচ মৌরি দিয়ে পাঁচ-১০ মিনিট রেখে এই জল দিনে দু’বার খান।
২। দারচিনি-
দারচিনির মধ্যে সিনামিক অ্যালডিহাইড থাকে। এই এসেনশিয়াল অয়েল মুখের ব্যাকটেরিয়া কমিয়ে বাজে গন্ধ রুখতে সাহায্য করে। এক কাপ জলের মধ্যে এক চামচ দারচিনি গুঁড়ো ফুটিয় সেই জল দিনে দু’বার মুখে ধুয়ে নিন। এই জলে তেজপাতাও মেশাতে পারেন।
৩। মেথি-
মুখের যে কোনও ইনফেকশন সারাতে অব্যর্থ মেথি। এক কাপ জলে এক চা চামচ মেথি দিয়ে ফুটিয়ে ছেঁতে নিয়ে এই চা দিনে এক বার খেলে মুখের গন্ধ দূর হবে।
৪। লবঙ্গ-
মুখের মধ্য কয়েকটা লবঙ্গ ফেলে রাখুন। চিবোতে থাকলে লবঙ্গের রস মুখের দুর্গন্ধ দূর করবে। এক কাপ জলে এক চা চামচ লবঙ্গ দিয়ে পাঁচ থেকে ১০ মিনিট ফুটিয়ে নিন। দিনে দু’বার এই লবঙ্গ চা খান।
৫। পার্সলে-
ক্লোরোফিল নিশ্বাসের দুর্গন্ধ রুখতে পারে। একটা-দুটো পার্সলে পাতা চিবিয়ে খান। ভিনিগারে ডুবিয়ে রেখেও পাতা চিবিয়ে খেতে পারেন। এই পাতার রস করে খেলেও দুর্গন্ধ কমবে, হজমও ভাল হবে।
৬। লেবুর রস-
এক কাপ জলে এক টেবিল চামচ লেবুর রস, নুন মিশিয়ে মুখ ধুয়ে নিন। মুখ শুকিয়ে যাবে না, দুর্গন্ধও দূর হবে।
৭। অ্যাপল সিডার ভিনিগার-
খাবার খাওয়ার আগে এক গ্লাস জলে এক টেবিল চামচ ভিনিগার মিশিয়ে খাওয়ার আগে খেয়ে নিন। এতে হজম ভাল হবে, দুর্গন্ধও কাটবে। এই জল দিয়ে গার্গলও করুন।
৮। বেকিং সোডা-
এক গ্লাসে গরম জলে আধ চা চামচ বেকিং সোডা মিশিয়ে ভাল করে কুলকুচি করে মুখ ধুয়ে নিন। বেকিং সোডা দিয়ে দাঁত মাজলেও উপকার পাবেন।
৯। টি ট্রি অয়েল-
টি ট্রি অয়েল যুক্ত টুথপেস্ট দিয়ে দাঁত মাজুন। দাঁত মাজার সময় যে কোনও টুথপেস্টের সঙ্গে টি ট্রি অয়েল, পেপারমিন্ট অয়েল বা লেমন অয়েল মিশিয়ে নিলেও উপকার পাবেন।
১০। চা-
খুব ভাল অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টের কাজ করে চা। দুধ ছাড়া চা বা হার্বাল টি খেলে মুখের দুর্গন্ধ দূর হবে।
